শহীদদের নামে জাহাজের নামকরণ, সম্মান নাকি দায়সারা উদ্যোগ?

আসগর আলী সাগরঃ

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটির নাম রাখা হয়েছে ‘অদম্য বাংলা’। অন্য চারটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চারজন আত্মত্যাগী সদস্যের নামে। নতুন নামগুলো হলো-বিসিজিএস নুরুল ইসলাম, বিসিজিএস ফিরোজ কবির, বিসিজিএস এম. হুমায়ুন কবির ও বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী।

নিঃসন্দেহে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই চার নৌসদস্যের নাম স্মরণে রাখার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাঁরা প্রত্যেকেই দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকার দাবি রাখে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের স্মরণে পুরোনো জাহাজের নাম পরিবর্তন করাই কি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের একমাত্র উপায় ছিল? তাঁদের নামে নতুন জাহাজ সংগ্রহ করে নামকরণ করা কি আরও মর্যাদাপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারত না?
কারা এই চার আত্মত্যাগী নৌসদস্য?বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া তথ্যে শহীদ নৌসেনাদের বিষয়ে যা জানলাম তাই বলছি- প্রথমেই আসা যাক লিডিং সিম্যান (সিডি) এম নুরুল ইসলামের কথায়। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন ডুবুরি ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট BANBAT-2-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মিলিশিয়াদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন তিনি। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ তাঁকে ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড’ পদকে ভূষিত করে।

দ্বিতীয়জন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফিরোজ কবির। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা শহীদ ফরিদের অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে তাঁর জাহাজ। সেই দুর্যোগের মধ্যে জাহাজের অন্য সদস্যদের সহায়তা করতে গিয়ে বিশাল ঢেউয়ে ভেসে নিখোঁজ হন তিনি। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হলেও তাঁর মরদেহ আর পাওয়া যায়নি।

তৃতীয়জন সিনিয়র চিফ পেটি অফিসার এম হুমায়ুন কবির। তিনি প্রেষণে র‍্যাব-১১ তে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৭ সালের মার্চে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দায়িত্ব পালনকালে র‍্যাবের আরেক সদস্যসহ তাঁকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছিল।

চতুর্থজন ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম আশরাফ সিদ্দিকী। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিক্ষা শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন UNMISS-এ মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৮ সালের ২৬ জুন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী জাতিসংঘের গাড়িবহরে হামলা চালালে তিনি নিহত হন। পরে তাঁকেও মরণোত্তর ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড’ পদকে ভূষিত করা হয়।
এই চারজনের আত্মত্যাগের ইতিহাস জানার পর তাঁদের নামে জাহাজের নামকরণের বিষয়টি নিঃসন্দেহে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও গর্বের হয়ে ওঠে।
তবে সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলোর নাম পরিবর্তনের খবর বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে, যাঁদের নামে জাহাজগুলোর নামকরণ করা হয়েছে, তাঁরা আসলে কারা?দেশের জন্য তাঁদের অবদান কী? তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাই বা কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শহীদদের সম্মান জানাতে পুরোনো জাহাজের নাম পরিবর্তন না করে তাঁদের নামে নতুন জাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া যেত না?

যাঁরা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে জাতির অমূল্য সম্পদ। তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের নামে নতুন জাহাজ সংগ্রহ করে নামকরণ করা হলে সেটি হতে পারত আরও বড় ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরার একটি স্থায়ী মাধ্যম তৈরি হতো।

পুরোনো জাহাজের নাম পরিবর্তন করে শহীদদের নাম যুক্ত করাকে অসম্মান বলেই চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করতে চাই না। কারণ নামকরণের পেছনে শ্রদ্ধা ও সম্মানের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আরও দূরদর্শী ও মর্যাদাপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ কি ছিল না?
আমাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে তাঁদের নামে নতুন জাহাজ সংগ্রহ ও নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর বর্তমান জাহাজগুলোর পূর্বের নাম ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।

শহীদদের সম্মান শুধু তাঁদের নামে কোনো স্থাপনা, সড়ক কিংবা জাহাজের নামকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষণ, পরিবারগুলোর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের অবদান স্বীকৃতি দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই চার বীর সদস্যের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগ যেন কেবল নামফলকে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং রাষ্ট্রের ইতিহাস ও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।

তথ্যসূত্র: এই চার নৌসদস্যের জীবন ও আত্মত্যাগ সম্পর্কিত কিছু তথ্য প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েবের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *