নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাবা নেই এই সত্য মেনে নিয়েই কেটে গেছে ১০টি বছর। কিন্তু সময়ের স্রোত মুছে দিতে পারেনি তাঁর স্মৃতি। বরং বছর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে হারানোর বেদনা। বাবার কথা উঠতেই স্মৃতির ভারে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, চোখে জমে অশ্রু। সেই শূন্যতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। বললেন, ‘বাবাকে হারানোর শূন্যতা আজও কাটেনি।’ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে নাটোরের লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির প্রবীণ নেতা ফজলুর রহমান পটলের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তাঁর ছোট মেয়ে প্রতিমন্ত্রী পুতুল। বাবাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা শুধু আমাদের পরিবারের অভিভাবক ছিলেন না, তিনি ছিলেন নাটোরের অসংখ্য মানুষের আপনজন। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকার উন্নয়নে কাজ করাকে বাবা রাজনীতির দায়িত্ব মনে করতেন। মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখতেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জনসম্পৃক্ততা আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেন পুতুল।
স্মরণসভায় সহস্রাধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল। স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও দীর্ঘদিনের অনুসারীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে ফজলুর রহমান পটলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক এবং এলাকার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার কথা। লালপুর উপজেলা ও গোপালপুর পৌর বিএনপি এবং সব সহযোগী সংগঠন এ স্মরণসভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব হারুনর রশীদ পাপ্পু। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পটলের ছোট ছেলে ইস্তেখার আরশাদ। স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাড রুহুল আমিন তালুকদার টগর, যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ডিউট, রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন, নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য তরিকুল ইসলাম টিটু, বাগাতিপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক নেকবর হোসেন ও গোপালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি কলেজ সাবেক প্র- ভিপি মোসাদ্দেকুল ইসলাম ফটিক প্রমুখ।
রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, ফজলুর রহমান পটল কর্মীদের প্রতি আন্তরিক ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি নিজের এলাকার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন।
স্মৃতিচারণ করে উপস্থিত বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ফজলুর রহমান পটলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, জনসম্পৃক্ততা ও এলাকার উন্নয়নে অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি নাটোর জেলার প্রথম মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, ১৯৯৩ সালে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বক্তারা আরও বলেন, ১৯৪৯ সালের ২৪ এপ্রিল লালপুরের গৌরীপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া পটল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৭৩ সালে রাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৮ সালে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে দলের প্রচার সম্পাদক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রী হিসেবে আজিমনগর রেলস্টেশন ভবন, লালপুর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্টেডিয়াম, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন বক্তারা।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার রবীন্দ্র হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফজলুর রহমান পটল। মৃত্যুর এক দশক পরও স্মরণসভায় মানুষের উপস্থিতি আর স্বজনদের আবেগ যেন বলে দিল—সময় চলে গেলেও কিছু মানুষের শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। মানুষের জন্য করা কাজ আর ভালোবাসার স্মৃতিতেই তাঁরা বেঁচে থাকেন।
