আমেরিকার সঙ্গে ‘গোলামির বাণিজ্য চুক্তি’ বাতিলের দাবিতে রাজশাহীতে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বিক্ষোভ

 

​নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী :

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিকে ‘গোলামির চুক্তিপত্র’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহীর ‘ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা’।

২১ মে (বৃহস্পতিবার) রাজশাহী কোর্ট শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা ৩২ পৃষ্ঠার ওই চুক্তিপত্রে আগুন ধরিয়ে দেন।

সমাবেশ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের (বক্তব্যে খলিল হিসেবে উল্লিখিত) গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করা হয়।

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র তিন দিন আগে দেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে সম্পূর্ণ গোপনীয়ভাবে আমেরিকার সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদন করে ইউনূস সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে বিদেশিদের সঙ্গে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বা নীতিগত চুক্তি করার কোনো আইনি অধিকার তাদের ছিল না। এই চুক্তি স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার শামিল। বিশ্বসন্ত্রাসী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রণীত যে ‘পাল্টা শুল্কনীতি’র ওপর ভিত্তি করে এই বাণিজ্য চুক্তি তৈরি করা হয়েছে, তা খোদ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘অবৈধ’ বলে বাতিল ঘোষণা করেছে। সুতরাং একটি বাতিলকৃত নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি চুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে এই দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে।

পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে (যেখানে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত হারাম করা হয়েছে) সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ৯৮ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে মার্কিন চুক্তির মাধ্যমে শূকরের গোশতজাত বিভিন্ন খাবার আমদানির তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, ব্রাটওয়ার্স্ট, ক্যাগিকোলা, কিয়েলবাসা, মর্টাডেলা, প্যানচেটা, প্রসিউট্টো ও সালামের মতো খাবার রয়েছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

চুক্তির বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বক্তারা বলেন, চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা থেকে বিষাক্ত জিএমও (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) খাবার আমদানি করা হলেও বাংলাদেশ তা আলাদা কোনো পরিচয় বা লেবেল দিয়ে চিহ্নিত করতে পারবে না। অথচ জিএমও খাবার মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং তা ক্যানসারের অন্যতম কারণ। শুধু তাই নয়, আমেরিকা তাদের খাবারের যে ‘হালাল সনদ’ দেবে, সেটিই বাংলাদেশকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হবে। ফলে দেশের মানুষ হালাল-হারাম খাবার যাচাই করার অধিকার হারাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী বার্ড ফ্লু মহামারি দেখা দিলেও সেখান থেকে মুরগি বা ডিম আমদানি সচল রাখতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে। সোজা কথায়, আমেরিকা বিষ দিলেও তা দেশের মানুষকে গিলতে হবে।

রপ্তানি বৃদ্ধির রাষ্ট্রীয় দাবির সমালোচনা করে বক্তারা ‘দৈনিক ইনকিলাব’ পত্রিকার গত ১১ মে-র প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জানান, গত ৪ মাসে আমেরিকা থেকে আমদানি ১০০% বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩%। ফলে এই চুক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ টেনে সমাবেশে বলা হয়, দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছিল—পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত। যে ইশতেহার দেখিয়ে তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তা তাদের রক্ষা করতে হবে।

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশদ্রোহী চুক্তির অপরাধে ড. ইউনূস ও খলিলকে গ্রেপ্তার করে শরীয়ত অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করতে হবে।

একই সমাবেশ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধের দাবি জানানো হয়।

বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যদি হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না করে, তবে বাংলাদেশের ৫০ কোটি, ভারতের ৪০ কোটি এবং পাকিস্তানের ৩৫ কোটি মুসলমান একত্রে মিলে ভারত দখল করবে, ইনশা-আল্লাহ।”

সমাবেশ থেকে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি আরও ৬টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়: ১. ভারতীয় মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ২. দেশের নওমুসলিমদের (নবদীক্ষিত মুসলমান) রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ৩. ৯৮% মুসলমানের দেশে শূকরের গোশত আমদানির চুক্তি বাতিল করতে হবে। ৪. পার্বত্য চট্টগ্রামে মসজিদ নির্মাণে বাধা প্রদানকারী উপজাতি সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. বিষাক্ত জিএমও খাদ্য আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ৬. বাংলাদেশের যেসকল হোটেল-রেস্তোরাঁয় ‘নো-বিফ’ (গরুর গোশত নেই) চিহ্ন ঝুলছে, সেগুলো বন্ধ করে প্রতিটি হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাধ্যতামূলক গরুর গোশত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

সহস্রাধিক নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশের শুরুতে সঞ্চালক মুহাম্মদ মুশফিক আরেফীন সবুজ সবাইকে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর সংগঠনের সদস্য সচিব মুহাম্মদ আশিক আহমদের পরিচালনায় উপস্থিত নেতা-কর্মীরা স্লোগান দেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন সমন্বয়ক মোমিনুল ইসলাম রাজা (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) এবং মুহিব্বুল।

পরবর্তী ধাপে সদস্য সচিব আশিক আহমদের ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবং পটভূমিতে চলমান স্লোগানের মধ্যে ৩২ পাতার বিতর্কিত চুক্তিপত্রটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

সমাবেশে মুখ্য বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের আহ্বায়ক মুহাম্মদ সুজন আলী।

সবশেষে সংগঠনের উপদেষ্টা মাওলানা মুহাম্মদ আতিকুর রহমান সমাপনী বক্তব্য ও দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন এবং সঞ্চালক মুহাম্মদ মুশফিক আরেফীন সবুজের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে সমাবেশ সমাপ্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *