সাংবাদিক আলিফ হত্যা: ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র, ৯০ দিনে বিচার শেষের দাবি

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন সাংবাদিক নেতারা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইউনিট যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। পরে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইউনিটের চেয়ারম্যান ও প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক খাইরুল আলম, সভাপতি আরিফুল ইসলাম, কার্যকরী সভাপতি সজীব রাজভর, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. মোহন মিয়া, সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম, সমকালের কেন্দুয়া উপজেলা প্রতিনিধি সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা এবং নিহত সাংবাদিক আলিফের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকিরসহ সাংবাদিক নেতারা।

বক্তারা বলেন, সাংবাদিক আলিফকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু একটি পরিবারের স্বজনকে হত্যা করা হয়নি, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। আলিফ সীমান্ত এলাকার চোরাচালান, অপরাধ ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

মানববন্ধন থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।

আদালতে দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

এদিকে সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও মো. সাব্বির আহম্মেদ (২৫) আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত রোববার (১ নভেম্বর) দুর্গাপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়ার কাছে তাঁরা জবানবন্দি দেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুল ইসলামের নাম এসেছে এবং সরাসরি পাঁচজন এতে অংশ নিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে জবানবন্দির সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে গত ৩১ অক্টোবর ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে ইমন ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর রাতে আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে মামলায় মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

যেভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা

পুলিশ ও মামলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ। তিনি বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে তিনি সীমান্ত এলাকার চোরাচালান, অপরাধ ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।

ঘটনার পরদিন নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ওরফে খাদিজা আক্তার দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তে একাধিক সংস্থা কাজ করছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দি থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

মানববন্ধনে সাংবাদিক নেতারা বলেন, তদন্তে উঠে আসা প্রতিটি তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত হত্যাকারী ও নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো অপরাধী যেন তদন্তের দুর্বলতার সুযোগে পার পেয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

তাঁরা সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *