বাংলাদেশে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা দিন দিন একটি গুরুতর সামাজিক উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে উঠে আসছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যাসংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। এসব ঘটনায় মানসিক চাপ, পরীক্ষাজনিত উদ্বেগ, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক তুলনার মতো বিষয়গুলো প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত সংকট নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার একটি বহিঃপ্রকাশ।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অন্তত ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর আগের বছর ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫১৩ জন, আর ২০২২ সালে ছিল ৫৩২ জন। যদিও ২০২৪ সালে সংখ্যাগতভাবে কিছুটা হ্রাস লক্ষ্য করা যায়, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই হ্রাস প্রকৃত পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। সামাজিক লজ্জা, আইনি জটিলতা এবং পারিবারিক চাপের কারণে অনেক ঘটনা এখনও অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে, যা প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করছে।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঘটনার প্রায় ৬০ থেকে ৬১ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী। এই প্রবণতা আগের বছরগুলোতেও লক্ষ্য করা গেছে। সামাজিক বিধিনিষেধ, পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এই সবকিছু একসঙ্গে নারী শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। মোট ঘটনার প্রায় ৬৫ থেকে ৬৬ শতাংশই ঘটেছে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কৈশোর বয়সে আবেগীয় বিকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। এই সময়ে ব্যর্থতা, লজ্জা বা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অনুভূতি শিক্ষার্থীদের গভীর মানসিক সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
শিক্ষা স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। আত্মহত্যায় নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি (প্রায় ৪৯ শতাংশ)। এরপর রয়েছে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী (প্রায় ২৩ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী (প্রায় ১৭–১৮ শতাংশ) এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী (প্রায় ৬–৭ শতাংশ)। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, মানসিক চাপ সবচেয়ে বেশি জমা হয় স্কুল পর্যায়েই, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজের অনুভূতি প্রকাশ বা সহায়তা চাইতে তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ২৯ শতাংশ। এর পর রয়েছে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগ। নগরায়ন, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা পরিবেশ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এই বিষয়গুলো শহরাঞ্চলে ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যদিও গ্রামাঞ্চলেও সমস্যা কম নয়।
কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পেছনে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে একাডেমিক ফলাফল নিয়ে হতাশা ও চাপ সবচেয়ে বড় অংশ, যা প্রায় ৩০–৩২ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি প্রেম বা সম্পর্কজনিত জটিলতা, পারিবারিক দ্বন্দ, আত্মসম্মানবোধে আঘাত, মানসিক অবসাদ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব কারণ আলাদা নয় বরং একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং ধীরে ধীরে মানসিক সংকটকে তীব্র করে তোলে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পরীক্ষা ও ফলাফল কেন্দ্রিক চাপ। এসএসসি ও এইচএসসি ফল প্রকাশের সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপের খবর নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। কিছু ঘটনায় কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নিজেদের মূল্যকে পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে একীভূত করে দেখেছে। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াকে তারা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নিয়েছে, যা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
সংবাদ বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, সামাজিক তুলনা ও লজ্জাবোধ এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সহপাঠী, বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে তুলনার আশঙ্কা এবং “মানুষ কী বলবে” এই ভাবনা অনেক শিক্ষার্থীকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি পরিবারকে হতাশ করার ভয় ও অপরাধবোধও বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল প্রকাশ কেবল একটি তাৎক্ষণিক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে; প্রকৃত চাপ তৈরি হচ্ছিল পরীক্ষার পুরো সময়জুড়ে, দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক ক্লান্তির মাধ্যমে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এই সংকট সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের প্রাথমিক বক্তব্যে আত্মহত্যার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় একাডেমিক চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা, ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ঘাটতি স্পষ্টভাবে আলোচনায় এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আচরণবিধি, শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ এবং কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত বা প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক কৌশল।
শিক্ষার্থী আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্কুল-কলেজ ভিত্তিক নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ফলাফল কেন্দ্রিক সামাজিক চাপ কমানো এবং সহায়তা চাইতে পারার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো সহায়তা পেলে অনেক ঝুঁকিই কমানো সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষার্থী আত্মহত্যা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকেত। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যকে মূলধারায় আনা, সহায়তা কাঠামো শক্তিশালী করা এবং পরিবার–শিক্ষক– সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
ড. মোঃ মাহিদ শেখ
সাইকোলজিস্ট
রাজশাহী।