নাবিল গ্রুপের দায়িত্বহীনতা ও মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে আসা!

সম্পাদকীয় কলাম
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন দল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স আজ ট্রফি নিয়ে ছাদখোলা দোতলা বাসে করে রাজশাহী নগরীজুড়ে বিজয় উদযাপন করেছে। নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বিজয় র্যালিটি পৌঁছায় রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের ফ্র্যাঞ্চাইজি নাবিল গ্রুপের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে, যা পবা উপজেলার দাউকান্দি এলাকায় অবস্থিত।
শুরুতে আমরা সাংবাদিকরা একটি মিনি পিকআপ বা ট্রাকে করে র্যালির সঙ্গে ছিলাম। নাবিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে পৌঁছানোর পর রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক নাজমুল হাসান শান্ত এবং উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
সাক্ষাৎকার পর্ব শেষে আমরা রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছাদখোলা দোতলা বাসে রওনা হই। যাওয়ার সময় যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই রাস্তাটি কিছুটা ভাঙাচোরা হলেও মোটামুটি নির্বিঘ্নেই চলাচল করা সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু পরে জানতে পারি, নাবিল গ্রুপের একজন জনৈক কর্মকর্তার নির্দেশে ফেরার পথে আমাদের ভিন্ন একটি পথে নেওয়া হয়।
নতুন পথে চলার সময় সড়কে থাকা গাছের ডাল বারবার বাসে আঘাত করতে থাকে। যদিও বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবে বারবার মাথা নামানো, গাছের ডালের আঘাত লাগার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছিল।
এরপর অনেক পথ আসার পরে নওহাটা কলেজ মোড়ের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা।
একটি বিদ্যুতের খুঁটির হাই-ভোল্টেজ তার বাসের সামনের অংশে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চোখের সামনে শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর সেই তারটি বাসের রেলিংয়ের সঙ্গে ঘষা লেগে আবারও আগুনের ফুলকি দেখা যায়।
ছাদে বসে থাকা আমরা সবাই এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে হুড়োহুড়ি শুরু হয়- কে কোথায় নামব, কীভাবে নামব- কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
যদিও আমাদের কয়েকজন ঠান্ডা মাথায় সবাইকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করছিলাম, তবু পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতেই বিদ্যুতের তারটি বাসের সঙ্গে আটকে গিয়ে খুঁটির সঙ্গে থাকা সংযোগ ছিঁড়ে যায়। আর সেই কারণেই রক্ষা পায় বাসে থাকা প্রায় শতাধিক মানুষ- যাদের মধ্যে ছিলেন বহু সাংবাদিক।
এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও দুঃখজনক বিষয় হলো- বাসে থাকা নাবিল গ্রুপের কোনো কর্মকর্তাকে অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখিনি আমাদের কাছে এসে ন্যূনতম সান্ত্বনা দিতে কিংবা খোঁজখবর নিতে।
এ সময় পথচারী ও ঘটনাস্থলে থাকা সাধারণ মানুষদের মুখেও একটি প্রশ্ন ঘুরছিলগ এই দোতলা বাসটি কেন এমন সড়কে ঢুকল?
আমরা সবাই জানি, আজ যদি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেত, তাহলে তার দায় হয়তো কেউই নিত না।
হয়তো নাবিল গ্রুপও না, এমনকি রাষ্ট্রও না।
আমরা পরিণত হতাম কেবল ‘দুর্ঘটনা’ শব্দের একটি সংক্ষিপ্ত খবরের শিরোনামে।
আলহামদুলিল্লাহ, শারীরিকভাবে আমাদের কারও তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু সেখানে যারা উপস্থিত ছিলাম, আমরা প্রত্যেকেই মানসিকভাবে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি।
ঘটনার সময় থেকে এখনও সেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারছি না। সসময় যে সকল সহকর্মীরা সেখানে ছিলেন তাদের অবস্থাক হয়তো আমার মতোই হয়ে আছে৷ জীবনে যে কত ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো, তা আসলে লিখে পুরোটা প্রকাশ করা সম্ভব না।
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- উদযাপন যেমন প্রয়োজন, নিরাপত্তা তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন।
সামান্য অবহেলাই যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে, আজকের ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
আর একটি প্রশ্ন- ঘটনা কি নাবিল গ্রুপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কানে পৌঁছেছে?
যদি পৌঁছে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে তারা কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেবেন?
কারণ পরেরবার হয়তো ঘটনা “অল্পের জন্য রক্ষা” হবে না- বরং সেটিই হতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনার শিরোনাম।
রাজশাহীর একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাবিল গ্রুপ ও এ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়- তাদের উদ্যোগে এ অঞ্চলের বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
তবে দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু ব্যক্তির কারণে যেন প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারি থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন, আমিন।