দুদকের সেই ‘দাপুটে’ শরীফ এখন দোকানদার

0

নিউজ ডেস্ক: মো. শরীফ উদ্দিন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরিচ্যুত উপ-সহকারী পরিচালক। চাকরি হারিয়ে এক সময়ের দাপুটে এই দুদক কর্মকর্তা সংসার চালানোর জন্য হয়েছেন কনফেকশনারি দোকানি। চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ‘ওমর কফি শপ’ নামের দোকানটিতে নিয়মিত বসেন। নতুন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর বেশিরভাগ মানুষ তাকে সাধুবাদ জানালেও শরীফ বলছেন, ‘জীবন তো বাঁচাতে হবে। তাই দোকানে বসেছি।’

বলা চলে, কয়দিন আগেও ‘দুদকের শরীফ’ বলে বাচ্চাদের কান্না থামানো হতো। ঘুম পড়ানো হতো কান্নারত বাচ্চাদের। যার নাম শুনে অনেক দুর্নীতিবাজ দুর্নীতি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সরকারি আমলা থেকে শুরু করে বড় বড় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সিআইপি, আইনজীবী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যারা নাকি ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তাদের কাছে শরীফ উদ্দিন ছিলেন আতঙ্কের নাম। তবে কারও বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়ার কারণে প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে চাকরি হারান শরীফ। এখন তার সংসার চালানোই দায়।

শরীফ চাকরি হারিয়ে যখন মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, যখন পরিচিত মুখগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিলেন, তখন সংসার চালানোর তাগিদে এই ওমর কফি শপ নামের কনফেকশনারিতে দোকানদারি শুরু করেন শরীফ উদ্দিন। দোকানটি তার ভাইয়ের।

জানা যায়, দুদকের বড় বড় অভিযোগের ফাইল অনুসন্ধানে নিয়োজিত ছিলেন মো. শরীফ উদ্দিন। বিশেষ করে কক্সবাজারে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ কাজে দুর্নীতি, প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পখ্যাত কক্সবাজার পৌরসভার পানি শোধনাগার প্রকল্পে অনিয়ম উদঘাটন, রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতির উৎস অনুসন্ধান, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির মূল উৎপাটন, কর্ণফুলী গ্যাসের বড় বড় রাঘববোয়ারের বিরুদ্ধে তদন্ত করে মামলার সুপারিশ করেছিলেন। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দিয়েছিলেন। কক্সবাজারের জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে ২২ জন আমলা, তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়টি কাল হয়ে দাঁড়ায় শরীফ উদ্দিনের। ২০২১ সালের ১৬ জুন তাকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। পরে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের চাকরি বিধিমালা ৫৪ এর ২ ধারায় কমিশনের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতাবলে শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

দুদকের চাকরি বিধিমালা ৫৪ এর ২ ধারায় বলা আছে, ‘এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দর্শাইয়া কোনো কর্মচারীকে নব্বই দিনের নোটিশ প্রদান করিয়া অথবা নব্বই দিনের বেতন নগদ পরিশোধ করিয়া তাহাকে চাকরি হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শরীফের দেওয়া অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়নি, উল্টো কোনো আইন না মেনে ওইসব মামলা পুনরায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তদন্ত করে বড় বড় আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এদিকে নতুন পেশা শুরুর পর রোববার (৬ নভেম্বর) দুপুরে ষোলশহর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ওমর কফি শপে কথা হয় শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এক মাস ধরে দোকানে বসছি। আমাকে অপসারণের পর দুদকসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা আমার স্থায়ী-অস্থায়ী সবগুলো বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছে। অপসারণের পর বেনামি একটি অভিযোগ করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, আমি নাকি হাজার কোটি টাকার মালিক, আমার ৩৭টি বাড়ি আছে, সিঙ্গাপুরে নাকি ৪টি বাড়ি আছে। এগুলো কই?’

এখন সংসার কীভাবে চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যা না করলে নয়, তাই করতে হচ্ছে। আগে সরকারি চাকরি করতাম, প্রতি মাসে বেতন আসতো। তাতে সংসার চলতো। এখন কোনো কাজ নেই, সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিবারের খরচ, বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ, মায়ের ওষুধ- কোনোটাই তো বন্ধ নেই। অপসারণের পর ছোটখাটো হলেও একটি চাকরি নিতে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে গিয়েছি, যাতে আমার পরিবারের খরচটা চালাতে পারি। কিন্তু দুদকের ভয়ে কেউ চাকরি দিতে চায় না। কিছু একটা তো করতে হবে, জীবন তো বাঁচাতে হবে। তাই দোকানে বসেছি।’

পরোক্ষভাবে অনেক হুমকি পাওয়ার কথাও জানান দুদকের এই আলোচিত কর্মকর্তা। যখন তার সঙ্গে কথা হয় তখন তিনি দোকানের ক্যাশ সামলাচ্ছিলেন। ক্রেতাদের জিনিসপত্র দিচ্ছিলেন, আর দাম নিয়ে ক্যাশবাক্সে রাখছিলেন।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাকে রাস্তার ফকির বানাবে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরাবে। দেশান্তরি করবে-এমন হুমকি দেওয়া হচ্ছিল অনেক দিন থেকে।’

কেন এমন হুমকি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি যে কাজগুলো করেছি, তার মধ্যে আলোচিত ৫টি ইস্যু নিয়ে প্রভাবশালীরা আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপেছেন। প্রথমত, কক্সবাজারে সরকারি প্রকল্পে লাখ লাখ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে যে সুবিধাভোগী চক্র রয়েছে, যারা আমার কারণে অনেকটা কোণঠাসা হয়েছিলেন, তারাই আমার বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের এনআইডি, পাসপোর্ট পাওয়া এবং দেওয়ার পেছনে যে চক্রটি জড়িত তারাও আমার ওপর ক্ষেপেছে। তৃতীয়ত, পেট্রোবাংলার কর্ণফুলী গ্যাসে (কেজিডিসিএল) অনেক অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি মামলার সুপারিশ করেছিলাম, মামলাও করেছিলাম, তারাও আমার ওপর ক্ষিপ্ত। চতুর্থত, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের একটি ফাইল নিয়ে আমি কাজ করেছিলাম। তাছাড়া ফটিকছড়ির প্রভাবশালী চেয়ারম্যান জানে আলমের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছিলাম, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনিয়ম নিয়ে মামলার সুপারিশ করেছিলাম। আসলে সবগুলো চক্রের লোকজন এক হয়ে গেছে আমার বিরুদ্ধে।’

শরীফ উদ্দিন যেসব ঘটনায় মামলার সুপারিশ করেছিলেন এবং যেসব মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠিয়েছিলেন, সেসব ফাইলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা এনআইডি মামলার ২০টি সুপারিশ করেছিলাম, তার মধ্যে ১১টি মামলার বাদী আমি নিজেই। এছাড়া সাতজনকে আমি অ্যারেস্টও করেছিলাম। দুঃখজনক সত্য যে, কক্সবাজার সদরের পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করেছি, চট্টগ্রামের পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করেছি। বান্দরবান, ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় যেসব রোহিঙ্গা পাসপোর্ট পেয়েছে, অদ্যাবধি এগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত নেই।’

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের যে সম্পদ, যারা রোহিঙ্গাদের সাহায্য-সহযোগিতা দেয়, তাদের আইনের আওতায় না আনার কারণে তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই তো কয়েকদিন আগে গোয়েন্দা পুলিশ রোহিঙ্গা এনআইডি নিয়ে একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে, কাউন্টার টেরোরিজম ধরছে। দুর্ভাগ্যজনক, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে আমার মামলায় তদন্তে থাকা কক্সবাজারের সার্ভেয়ার আতিক পরে টাকাসহ বিমানবন্দরে ধরা পড়েছেন। তিনি ২৪ লাখ টাকাসহ ঢাকা বিমানবন্দরে ধরা পড়েছেন। কমিশনে জমা দেওয়া আমার সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখনো দুর্নীতিবাজ চক্রটি অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে।’

দুদকের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি যখন অভিযান পরিচালনা করতাম, তখন কমিশনের রেট কিছুটা কমলেও আমাকে অপসারণের পর আমার মামলাগুলোয় যারা অভিযুক্ত, তারা দ্বিগুণ উৎসাহে অনিয়মে জড়িয়েছে। সরকারি জমি অধিগ্রহণে অনিয়মগুলো আবার শুরু হয়েছে। ওই দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে যদি সরকারি কোষাগারে না আনা যায়, তাহলে তারা দুর্নীতি করতে উৎসাহী হবে। আমার অপসারণের পর এখন কক্সবাজারে অনেক দুর্নীতিবাজ যাদের পাসপোর্ট জব্দ ছিল, মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা মহামান্য হাইকোর্ট থেকে বৈধ করে ফেলেছে। যারা তথ্য গোপন করে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করেছে, তারাই তাদের পাসপোর্ট বৈধ করে ফেলেছে।’

শরীফ বলেন, ‘২০১৮ সালের পর থেকে ১৩০টি দুর্নীতির বড় বড় নথি নিয়ে কাজ করেছি। এসব নথি নিয়ে কাজ করার কারণে শরীরে নানা রোগ ডানা মেলছে। বিশেষ করে কোলস্টেরল, হাইপ্রেসার, ডায়াবেটিস, অ্যাংজাইটি নিয়ে চিকিৎসক অনেক ওষুধ দিতেন। এসব ওষুধ সেবনও অনেক ব্যয়বহুল। এখন আমি চাইলেও আগের মতো কন্টিনিউ করতে পারবো না। ডাক্তার আমাকে মাইন্ড ডাইভার্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন। চিকিৎসক বলেছেন, আমি অনেক বিধ্বস্ত, সুইসাইডাল টেনডেনসি আমার ভেতরে নাকি কাজ করছে। তারপরও আমি মানসিকভাবে অনেক দৃঢ়। চিকিৎসককে বলেছি, আমি কখনো সুইসাইট করবো না। আমি দেশান্তরিও হবো না। আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। আমি দেশকে ভালোবাসি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, আমি সেই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। ক্রিমিনাল ইনটেনশন (অপরাধ প্রবণতা) নিয়ে কোনো কাজ করিনি। গুড ফেইথ (বিশ্বস্ততা) নিয়ে কাজ করেছি। আমার ভুল হতে পারে, কারণ যারা কাজ করেন, তাদের ভুল হবে। যাদের কাজ নেই, তাদের ভুলও নেই। দুদক আমাকে সুযোগ দিতে পারতো।’

‘দুর্নীতিবাজ চক্রগুলো আমার বিরুদ্ধে এখনো বেনামি চিঠি দিয়ে যাচ্ছে। আমি নাকি ইয়াবাখোর, গাঁজাখোর। আমি জীবনে কখনো সিগারেট খাইনি। হাতও দেইনি। এই দোকানে বসে ক্রেতাদের দেওয়ার জন্য হাতে সিগারেট ধরেছি। তাও কাস্টমারদের দেওয়ার জন্য। আমি একজন ভেটেরিনারি চিকিৎসক। ধূমপান ক্ষতিকর, সেটা আমার জানা আছে।’ যোগ করেন তিনি।

নতুন জাযগায় কাজ শুরুর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি খ্যাতির বিড়ম্বনার কথা জানান। বলেন, ‘দেশের মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, সেই ভালোবাসার কারণে আমি এখনো টিকে আছি। চাকরি হারানোর পর এই ৯ মাসে আমার প্রতি গণমাধ্যমের যে ভালোবাসা, তাতে আমি অভিভূত।’

সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তি সম্পর্কে শরীফ বলেন, ‘যারাই আমাকে চেনেন, তারা আমাকে এখন অভিনন্দন জানাচ্ছেন। বলছেন, আপনি হালাল ব্যবসা করছেন। অনেকে দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে। আপনি সেই পথে না গিয়ে হালাল একটি ব্যবসা করছেন। এটাই সবার জন্য শিক্ষা হওয়া উচিৎ।’

পরিবারের সাপোর্ট পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভেটেরিনারি ডাক্তার ছিলাম। আমি চাইলেই তো আগের মতো চলতে পারবো না। আমার ফ্যামিলি আমার দিকটা বিবেচনা করে। বাচ্চাদের আমি মুখ দেখাতে পারি না। আগে বিভিন্ন অনুসন্ধান নিয়ে আমি রাতের পর রাত কক্সবাজারে থাকতাম। এখন বাসায় বসে থাকি। এখন সন্তানেরা প্রশ্ন করে, বাবা তুমি এখন কক্সবাজার যাও না?। যখন কয়েকজন লোক আমার বাসায় এসে আমাকে হুমকি দিয়ে গেলো, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আবার বাচ্চা আমাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা তোমাকে মারতে আসছে কেনো? তুমি কাঁদো কেনো? আসলে এগুলোর কোনো উত্তর নেই।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে