রাজশাহীতে চলছে গাছ কর্তন, নির্দেশে কারা?

0

মানিক হোসেন, রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ১১ ও ১৩ নং ওয়ার্ডের হেতেম খাঁ গোরস্তানে ৫ এর অধিক বৃক্ষ কর্তন করার দৃশ্য দেখা গেছে। বৃক্ষ কর্তন নিষিদ্ধ এমন বাক্য প্রয়োগে কর্মরত লোকবল জানায়, সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশ রয়েছে। আপনারা কারা, কে পাঠিয়েছে?

রবিবার (২৭ নভেম্বর) বেলা ২ টায় সরেজমিনে দেখা মেলে কয়েকজন শ্রমিকের গাছ বহন করে গাড়িতে তোলার দৃশ্য।

প্রতিবেদকের ভিডিও ও চিত্র ধারণের সময় ওই শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কবরস্থানের রাস্তা পরিষ্কার ও কবরস্থানের সমস্যা সৃষ্টিকারী বৃক্ষগুলো কর্তন করা হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।

তার কিছুক্ষণ শরিফুল ইসলাম নামের একজন কর্মী ছুটে আসেন। এসে প্রতিবেদককে প্রশ্ন ছুড়েন, কারা আপনারা, কোথায় থেকে এসেছেন?

প্রতিবেদকের পরিচয় দেয়ার পরে জানান, মোঃ মতিন নামের লাইসেন্স ব্যবহার করে ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মোমিন ও ১১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবিউল ইসলাম তজুর নির্দেশে তিনি এই বৃক্ষ কর্তন করছেন।

তিনি আরও জানান, এই বৃক্ষের টাকা কবরস্থান সংলগ্ন মাদ্রাসায় দেয়া হবে।

শরিফুল ইসলামের সহযোগিতায় বিস্তারিত জানতে মাদ্রাসায় কর্মরত রনি নামের ব্যক্তিকে ফোন দেয়া হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।

বৃক্ষ কর্তনে জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন বা নির্দেশ আছে কি না তা সম্পর্কে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় ১১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবিউল ইসলাম তজুর সাথে। তিনি জানান, ১৫ দিন থেকে আমি কবরস্থানে যাইনি। সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশ আছে কিনা জানি না।

১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মোমিন জানান, কবরস্থানের স্বার্থে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশে বৃক্ষ কর্তন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

উল্লেখ্য যে, সংসদ ভবন থেকে জানা যায় : সরকারের অনুমতি ছাড়া বন, সড়কের পাশের ও পাবলিক প্লেসের গাছ কাটলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল, ২০১২’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।

দেশের জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশ ও পরিবেশন সংরক্ষণে সরকারি জমিতে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাছ সংরক্ষণ করতেই এ বিলটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। পরে বিলটি এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দেশের বনজ সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয় বন নীতি ঘোষণা করেছে। দেশের যথাযথ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৮৯ সাল থেকে প্রাকৃতিক বনের গাছ আহরণ বন্ধ রাখা হয়েছে।

সংরক্ষিত বন ছাড়াও সরকারি ভূমিতে অবস্থিত অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক গাছ অপ্রয়োজনে কাটা হচ্ছে। এছাড়া বহু পুরাতন ঐতিহ্যবাহী গাছ কাটার ঘটনা অহরহ ঘটছে। অথচ এ ধরণের বন বাগানে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন নির্ভরশীল। এভাবে গাছ কাটায় দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বনের অবক্ষয় রোধের প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। ’

মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু বননীতি ঘোষণা ও সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বৃক্ষ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকবেলায় বৃক্ষ সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরো কার্যকর করার কোন বিকল্প নেই। ’
বিলের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার বনভূমি, সরকারি বনভূমি বা পাবলিক প্লেসের কোন গাছকে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে বিধি দ্বারা নির্ধারিত সংরক্ষণযোগ্য গাছ হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।

তবে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত বন ও পাহাড়ি এলাকার কোন গাছকে সংরক্ষণযোগ্য ঘোষণার আগে ওই এলাকার প্রথাগত নেতৃত্বের (হেডম্যান, কারবারি ইত্যাদি) মতামত নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে বিলে।

একই ধারার ৪ উপ-ধারায় বলা হয়েছে- পাবলিক প্লেসের কোনো গাছ শুকিয়ে গেলে বা মরে গেলে পাখি অথবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে ওই গাছটি সংরক্ষণ করতে হবে। তবে গাছটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সরকারের অনুমতি নিয়ে সেটি সরিয়ে ফেলা যাবে।

এছাড়া প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, প্রাকৃকি দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা পড়ে যাওয়া গাছ স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়ে সরানো যাবে।

বিলের ৫ ধারায় বলা হয়েছে- কোন ব্যক্তি এ আইনের লঙ্ঘন করলে বা সহায়তা করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানায় দ-িত হবেন।

আরও বলা হয়েছে- যদি কোন সরকারি দফতর বা বিভাগের কেউ এ আইন লঙ্ঘণ করে তবে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ও ওই বিভাগের প্রধানকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এক্ষেত্রে যদি দোষী সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রমাণ দিতে পারেন যে- এ আইনের লঙ্ঘন তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে এবং তিনি গাছ কাটার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছেন, তবে তাকে দোষী করা হবে না।

বিলের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন সরকারি কর্মকর্তা যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করে তবে ওই কর্মকর্তা দোষী বলে গণ্য হবেন।

এ অপরাধের জন্য ওই কর্মকর্তার সর্বোচ্চ ২ মাসের জেল ও ২০ হাজার টাকার জরিমানা হবে।

অন্যদিকে সচেতন মহল থেকে জানান, বৃক্ষ কেটে কবরস্থানের উন্নয়ন হচ্ছে ভালো কথা। কিন্তু, বৃক্ষ রোপন কোনো প্রক্রিয়া কি চলমান আছে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে