টিকিট ছাড়া ট্রেনে ভ্রমণ মন্ত্রী চিনতে না চাইলেও তারা আত্মীয়

0

ডেস্ক নিউজ ঃ রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের আত্মীয় পরিচয়ে বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করার অপরাধে তিন যাত্রীকে জরিমানা করেছিলেন ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই)। গত বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার পর ওই টিটিই শফিকুল ইসলামকে বরখাস্ত করার খবর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রী অবশ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, ট্রেনের ওই তিন যাত্রীর সঙ্গে তার আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের তিনি চেনেনও না। সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণেই বরখাস্ত হয়েছেন টিটিই।

তবে দৈনিক বাংলার পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আলোচিত তিন যাত্রীই রেলমন্ত্রীর বউয়ের সম্পর্কের আত্মীয়। মন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করেই তারা বৃহস্পতিবার রাতে ঈশ্বরদী থেকে আন্তনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কেবিনে উঠেছিলেন।
ট্রেনে নিয়মিত চেকিংয়ের সময় কর্তব্যরত টিটিই শফিকুল ইসলাম তাদের টিকিট দেখতে চান। শফিকুলের অভিযোগ, টিকিট নেই জানিয়ে তারা নিজেদের রেলমন্ত্রীর আত্মীয় বলে পরিচয় দেন।
এ অবস্থায় বিষয়ে পাকশী বিভাগীয় রেলের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (এসিও) মো. নুরুল আলমের সঙ্গে কথা বলে রেলমন্ত্রীর আত্মীয়দের সর্বনিম্ন ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটার পরামর্শ দেন টিটিই। তিনি ওই তিন যাত্রীকে এসি টিকিটের পরিবর্তে মোট ১ হাজার ৫০ টাকা নিয়ে জরিমানাসহ সুলভ শ্রেণির নন-এসি কোচে সাধারণ আসনের টিকিট করে দেন। এ সময় ট্রেনে কর্তব্যরত অ্যাটেনডেন্টসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেল কর্মকর্তা জানান, ওই তিন যাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত কোনো অভিযোগ না দিলেও ঢাকায় পৌঁছে তারা রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে টিটিই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগ পেয়ে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট টিটিইকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন।
আলোচিত তিন যাত্রীর নাম ও পরিচয় জানতে পেরেছে দৈনিক বাংলা। তারা হলেন ইমরুল কায়েস প্রান্ত, ওমর এবং হাসান। তাদের মধ্যে ইমরুল কায়েস টিটিই শফিকুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। লিখিত সেই অভিযোগে ইমরুল কায়েস প্রান্ত স্বীকার করেন, তিনি ও তার ছোট দুই মামা বিনা টিকিটে সুন্দরবন এক্সপ্রেসে চড়েছিলেন। কাউন্টার থেকে টিকিট না পাওয়ার কারণেই তারা এভাবে ট্রেনে চড়েন।
দৈনিক বাংলা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের শ্বশুরবাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীতে। সেখান থেকেই বৃহস্পতিবার ইমরুল কায়েস প্রান্ত ও তার দুই মামা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। প্রান্ত রাজধানীর বাড্ডার একটি টেক্সটাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন।
ইমরুল কায়েস প্রান্তর মা ইয়াসমিন আক্তার নিপা জানান, রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মী আকতার মনি তার ফুফাতো বোন। সে হিসেবে প্রান্ত রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের ভাগনে। আর বৃহস্পতিবার প্রান্তর সঙ্গে রেলযাত্রায় অংশ নেন মন্ত্রীর ছোট মামাশ্বশুর জাহাঙ্গীর আলমের দুই ছেলে হাসান ও ওমর।
ঈশ্বরদীর নুর মহল্লার কর্মকার পাড়ায় জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ছিলেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মী আকতার। পাবনায় এলে তিনি এই বাড়িতে ওঠেন। ওই বাড়ির আরেকটি অংশে থাকে প্রান্তর পরিবার।
অভিযোগে প্রান্তর দাবি, ট্রেন ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে টিটিই এসে টিকিট চান। তখন টিটিই শফিকুল তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে ১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করেন। প্রান্তরা টিকিট দাবি করলে শফিকুল তাদের উচ্চ স্বরে গালিগালাজ করেন।
শফিকুল ইসলাম ‘মাদকাসক্তের মতো আচরণ করছিলেন’ অভিযোগ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয় লিখিত অভিযোগপত্রে।
টিকিট ছাড়া কেন ট্রেনে উঠেছিলেন, জানতে চাইলে ইমরুল কায়েস প্রান্ত বলেন, ‘আমি অফিসের জরুরি কাজের জন্য ঢাকায় ফিরতে সেদিন রাত ২টায় বের হই। স্টেশনে টিকিট কাটতে যাই। তখন সেখান থেকে বলে টিকিট নেই। আমার সঙ্গে ছিল দুই ছোট মামা হাসান ও ওমর।’
প্রান্ত দাবি করেন, তারা ট্রেনে উঠে মাঝামাঝি নন-এসি একটি বগিতে বসেন। কিছুক্ষণ পর ট্রেন উল্লাপাড়ার কাছাকাছি পৌঁছালে টিটিই আসেন।
প্রান্ত বলেন, ‘ঈদের সময় ট্রেনে অনেক ভিড়। টিটিই বলেন কোথায় যাবেন? আমি বলি ঢাকায় যাব। টিটিই বলেন টিকিট করছেন? তখন আমি বলি, সিট পাইনি আর স্টেশনে টিকিট নিতে গিয়ে দেখি ট্রেন ঢুকে গেছে। তাই তাড়াহুড়া করে ট্রেনে উঠে গেছি। টিকিট নেয়া হয়নি। এ কথা বলার পরে উনি (টিটিই) বলেন, আপনারা জরিমানাসহ ৫০০ টাকা করে দেন প্রতিজন।’
এদিকে ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা জন্ম দিয়েছে। গতকাল শনিবার সকালেই ঘটনাটি প্রথম শুনেছেন বলে গণমাধ্যমে দাবি করেছেন রেলমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুনেছেন টিটিই শফিকুল ইসলাম বিনা টিকিটের যাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, রেলের অফিশিয়াল কার্যক্রমের সঙ্গে মন্ত্রীর কোনো সংযোগ নেই। ঘটনার সঙ্গে মন্ত্রীর কোনো আত্মীয় জড়িত নন। ওই টিটিইর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে মন্ত্রী কিছুই জানতেন না।

শফিকুলকে বরখাস্তের বিষয়ে পাকশীর ডিসিওর বক্তব্য
টিটিই শফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন পাকশীর রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্য কর্মকর্তা (ডিসিও) নাসির উদ্দিন।
বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, ‘গত ৫ তারিখ রাতে কিছু যাত্রী ঈশ্বরদী স্টেশনের কাউন্টারে আসেন। কিন্তু কাউন্টারে কোনো টিকিট পাননি। তাদের ঢাকা যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের যেখানে জায়গা পান সেখানেই উঠে পড়েন।
টিটিই শফিক ট্রেনে উঠে যাত্রীদের কাছ থেকে খুলনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত তিন হাজার টাকা করে ভাড়া দাবি করেন। তখন যাত্রীরা জানান, তারা ঈশ্বরদী থেকে টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রেনে উঠেছেন। তারা ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৩০০ টাকা করে ভাড়া নেয়ার জন্য টিটিকে অনুরোধ করেন। কিন্তু টিটিই জবাবে বলেন, ট্রেন কি তোর বাপের? তখন যাত্রী বলেন, ট্রেন কি তোর বাপের মানে কি? বিপদে পইড়া ট্রেনে উঠেছি। আপনি ভাড়াটা নেন।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তখন টিটিই বলেন দ্বিগুণ জরিমানাসহ খুলনা থেকে ভাড়া দিতেই হবে। তখন যাত্রীরা বলেন, এত টাকা আমাদের কাছে নেই। ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৩০০ টাকা করে রাখেন। তখন টিটি সাহেব বলেন, টাকা না দিলে লাত্থি দিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দিব। তারপর আরও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন।’
যাত্রীরা ‘টিটিইর মুখ থেকে এ ধরনের বকা শুনে চরম মর্মাহত হন’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, টিটিই অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে ওই ধরনের আচরণ করেন। তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণের জন্য ৩ মাস আগে টিটিই শফিককে পাকশী দপ্তরে বুক অফ করা হয়। তারপর তিনি যাত্রীদের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তাকে কর্মস্থলে ফেরত পাঠানো হয়।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘শফিক আইন বিষয়ে এলএলএম করেন। তিনি তার সহকর্মীদের জানান, তার সব বন্ধু জজ হিসেবে কর্মরত আছেন। কিন্তু তিনি ভালো একটি চাকরি পাননি বলে মানসিকভাবে খুব হীনম্মন্যতায় ভোগেন। কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে অকারণেই চিৎকার চেঁচামেচি করেন। তার নিয়ন্ত্রণকারী (এসআরআই) সাধারণ ডিগ্রি পাস বলে তাকে তাচ্ছিল্য করতেন।
মূলত তিনি তার মানসিক হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। এ জন্যই তিনি যাত্রীসাধারণের সঙ্গে বেশির ভাগ সময়ই অযাচিতভাবে খারাপ আচরণ করেন।’

৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি
পুরো বিষয়টি তদন্তে রেলের ৩ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি আজ রোববার কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের পশ্চিমের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার।
তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। আমি শুনে আশ্চর্য হয়েছি। এ ঘটনায় সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা, সহকারী প্রকৌশলী ও সহকারী কমান্ড্যান্টকে সদস্য করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামীকালের (রোববার) মধ্যেই আমরা এ ঘটনার শেষ করতে চাচ্ছি।’
মন্ত্রীর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় তো তার নিজ এলাকায় ছিলেন। তার আত্মীয় হওয়ার কথা না, আবার হতেও পারে। এ বিষয়ে আমি কনফার্ম না। যদি হয় তদন্তে সব বের হয়ে আসবে।’
মন্ত্রীর আত্মীয়রা অভিযুক্ত হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দোষীরা মন্ত্রী মহোদয়ের আত্মীয় হলে আমরা কী ব্যবস্থা নিতে পারি? আমরা তাদের কি বিচার করতে পারি? তবে মন্ত্রী মহোদয়কে জানাব যে ঘটনায় ওনারাই দোষী।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে